Skip to main content

তাবরিজ ও এর ইউনেস্কো-স্বীকৃত ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স

রেশম পথের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ছাদযুক্ত বাজার ব্যবস্থার স্থাপত্য, ইতিহাস ও বাণিজ্য

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ককেশাস, আনাতোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে এক অপরাজেয় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স, যা বিশ্বের বৃহত্তম আন্তঃসংযুক্ত ছাদযুক্ত ইট-নির্মিত বাজার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইলখানাত যুগ থেকে শুরু করে সাফাভি ও কাজার আমল পর্যন্ত এই মহিমান্বিত স্থাপনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।

Key takeaways

  • তাবরিজ বাজার কমপ্লেক্স ২০১০ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষিত হয় এবং এটি প্রায় ১ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
  • এটি বিশ্বের বৃহত্তম আন্তঃসংযুক্ত ছাদযুক্ত ইট-নির্মিত বাজার, যার মধ্যে প্রায় ৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছাদযুক্ত করিডোর রয়েছে।
  • ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইলখানাত সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে তাবরিজ এবং এর বাজার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।
  • বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কো পোলো ও ইবনে বতুতা উভয়েই মধ্যযুগে এই বাজারের অতুলনীয় সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
  • কমপ্লেক্সটির টিমচে-ই মোজাফফরিয়ে ইরানের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা পারস্য গালিচা বাণিজ্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও সক্রিয় কেন্দ্র হিসেবে অদ্যাবধি কার্যকর।

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ঐতিহাসিক আজারবাইজান অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত তাবরিজ নগরী সহস্রাব্দ প্রাচীন সভ্যতা ও বাণিজ্যের এক অনবদ্য কেন্দ্রবিন্দু। এর অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক হলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স (Bazaar of Tabriz), যা পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা সর্ববৃহৎ আন্তঃসংযুক্ত ও ছাদযুক্ত ইট-নির্মিত বাণিজ্য কেন্দ্র। প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বাজারটি কেবল নিছক পণ্যদ্রব্য কেনাবেচার প্রাঙ্গণ নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী নগর-কাঠামো, যার অভ্যন্তরে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাম্মামখানা (স্নানাগার), জুরখানেহ (ঐতিহ্যবাহী ব্যায়ামাগার) এবং সুবিশাল সরাইখানা সমন্বিত রয়েছে। রেশম পথ বা সিল্ক রোডের এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগস্থল হিসেবে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৌদ্ধিক, শৈল্পিক ও অর্থনৈতিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

তাবরিজের ভূ-কৌশলগত অবস্থান একে প্রাচীনকাল থেকেই এক অনন্য গুরুত্ব প্রদান করেছে। শহরটি সাহান্দ পর্বতমালার উত্তরে এবং একটি উর্বর উপত্যকায় অবস্থিত, যা আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরস্ক), ট্রান্সককেশিয়া এবং পারস্য মালভূমির মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করত। প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকেই এই অঞ্চলে বসতি বিদ্যমান থাকলেও, সেলজুক রাজবংশের আমলে (একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী) তাবরিজ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। তবে শহরটির স্বর্ণযুগের সূচনা ঘটে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে, যখন মঙ্গোল বিজয়ের পর প্রতিষ্ঠিত ইলখানাত সাম্রাজ্যের শাসকেরা তাবরিজকে তাদের সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন।

ইলখানাত সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাবরিজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী মহানগরীতে রূপান্তরিত হয়। এই সময়ে চীন, মধ্য এশিয়া, ভারতবর্ষ, মেসোপটেমিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপ থেকে বণিকদল নিয়মিত তাবরিজে সমবেত হতো। বিখ্যাত ভেনিসীয় বণিক ও পরিব্রাজক মার্কো পোলো প্রায় ১২৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাবরিজ ভ্রমণ করেন এবং এর সমৃদ্ধ বাণিজ্য সম্পর্কে লিখেছিলেন যে, এই শহরের ব্যবসায়ীরা বহুমূল্য রেশম ও স্বর্ণখচিত কাপড়ের বিপুল ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন। চতুর্দশ শতাব্দীর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে তাবরিজ পরিদর্শনের সময় এর জহরত বাজারের চোখধাঁধানো ঐশ্বর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে মূল্যবান মুক্তা ও রত্ন পাথরের উন্মুক্ত লেনদেন চলত।

স্থাপত্য রূপরেখা: ছাদযুক্ত ইটের মেগাস্ট্রাকচার

তাবরিজ বাজারের সবচেয়ে লক্ষণীয় স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য হলো এর সম্পূর্ণ ইট-নির্মিত আচ্ছাদিত কাঠামো। অঞ্চলটির চরম জলবায়ু—তীব্র শৈত্যপ্রবাহময় শীত এবং শুষ্ক রৌদ্রোজ্জ্বল গ্রীষ্ম—থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্থানীয় স্থপতিরা এক অতুলনীয় ইনডোর বাজার স্থাপত্যের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। কমপ্লেক্সটির প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলোকে বলা হয় 'রাস্তেহ' (Rasteh), যা দীর্ঘায়িত করিডোরের মতো বিস্তৃত এবং এর দুই পাশে সারিবদ্ধ দোকান বা 'দোক্কান' অবস্থিত। এই করিডোরগুলোর ছাদ নির্মিত হয়েছে খাঁজকাটা খিলান এবং গম্বুজের সমন্বয়ে, যার কেন্দ্রে রয়েছে বৃত্তাকার ওকুলাস বা আলোককূপ। এই ওকুলাসগুলোর মাধ্যমে প্রখর সূর্যালোক প্রতিসরিত হয়ে ভেতরের পরিবেশকে আরামদায়ক রাখে এবং গ্রীষ্মকালে গরম বাতাস বের করে দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসের সঞ্চালন নিশ্চিত করে।

বাজারের মৌলিক স্থাপত্য কাঠামোর মধ্যে কয়েকটি প্রধান উপাদান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ:

  • রাস্তেহ (Rasteh): বাজারের প্রধান এবং দীর্ঘতম হাঁটার করিডোর, যা নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক পণ্যের নামে চিহ্নিত (যেমন জুতা বাজার, টুপি বাজার)।
  • টিমচে (Timcheh): অত্যন্ত জটিল ও শৈল্পিক গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত সাধারণত দ্বিতল বাণিজ্যিক হল, যা অত্যন্ত মূল্যবান পণ্যের পাইকারি বাণিজ্যের জন্য নিবেদিত।
  • সরাই বা কারভানসারাই (Caravanserai): খোলা চত্বরযুক্ত সুবিশাল প্রাঙ্গণ, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিক কাফেলা পণ্য খালাস করত এবং রাত্রিযাপন করত।
  • চাহারসুক (Chaharsuq): দুটি প্রধান বাণিজ্যিক রাস্তার সংযোগস্থল, যা সাধারণত বিশাল ও জমকালো কারুকার্যময় গম্বুজ দ্বারা আবৃত থাকে।

টিমচে-ই মোজাফফরিয়ে ও পারস্য গালিচা সংস্কৃতি

তাবরিজ বাজারের সমস্ত টিমচেগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং সর্বাধিক বিখ্যাত হলো 'টিমচে-ই মোজাফফরিয়ে' (Timcheh-ye Mozaffariyeh)। এটি কাজার রাজবংশের শাসনামলে, আনুমানিক ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে যুবরাজ মোজাফফর আদ-দীন মির্জার নামানুসারে নির্মিত হয়। এই কাঠামোটি ইরানি সেক্যুলার ইট-স্থাপত্যের অন্যতম নিখুঁত নিদর্শন। এর বিস্তৃত কেন্দ্রীয় হলরুমের উপরে স্থাপিত সুবিশাল দ্বৈত-খিলানযুক্ত গম্বুজ এবং দুই স্তরের তোরণযুক্ত বারান্দা এর ভেতর এক অনন্য স্থাপত্যিক গাম্ভীর্যের সৃষ্টি করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে এবং বর্তমানেও এই টিমচে হলো বিশ্ববিখ্যাত তাবরিজি গালিচার প্রধান বিনিময় কেন্দ্র। তাবরিজের কার্পেট এর সূক্ষ্ম গিট (Knot density), সিল্ক ও উলের নিখুঁত মিশ্রণ এবং জটিল নকশার (যেমন হেরতি, শিকারের দৃশ্য বা মেহরাব নকশা) জন্য বিশ্বজুড়ে বন্দিত। টিমচে-ই মোজাফফরিয়েতে প্রতিদিন প্রবীণ কার্পেট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে গালিচা যাচাই-বাছাই ও মূল্য নির্ধারণ করেন, যা বস্তুগত বাণিজ্যের পাশাপাশি এক অবিচ্ছেদ্য জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চায় পরিণত হয়েছে।

ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞ ও স্থিতিস্থাপক পুনর্নির্মাণ

তাবরিজ অঞ্চলটি ভূ-তাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় শহরটি বারবার মারাত্মক ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে (১১৯৩ হিজরি) সংঘটিত এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে গোটা তাবরিজ নগরী এবং এর সুপ্রাচীন বাজার প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। আধুনিক যে বাজার কাঠামোটি আমরা আজ দেখতে পাই, তার সিংহভাগই কাজার আমলের প্রারম্ভে, বিশেষ করে নায়েব উস-সুলতানা আব্বাস মির্জার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় বণিকদের সম্মিলিত অর্থায়নে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং উনবিংশ শতাব্দীতে পুনর্নির্মিত হয়েছিল। এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সেলজুক ও সাফাভি যুগের আদি নকশা এবং লেআউটকে কঠোরভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছিল।

তাবরিজ বাজারের প্রধান কাঠামোগত উপাদানের তুলনামূলক বিবরণ
কাঠামোর নামমূল বাণিজ্যিক কার্যক্রমস্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যনির্মাণ/পুনর্নির্মাণ কাল
টিমচে-ই মোজাফফরিয়েসূক্ষ্ম হাতে বোনা গালিচা ও সিল্কউচ্চ গম্বুজবিশিষ্ট দ্বিতল অলংকৃত হল১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ (কাজার আমল)
টিমচে-ই আমিরসোনার গহনা ও মূল্যবান ধাতুবিশাল একতলা আর্কেড ও মজবুত তোরণঊনবিংশ শতাব্দী
সরাই-ই হাজি মির্জা জলিলআমদানি করা টেক্সটাইল ও সুতাখোলা সেন্ট্রাল কোর্টইয়ার্ডযুক্ত দ্বিতল সরাইখানাঅষ্টাদশ শতাব্দী
রাস্তেহ-ই কাফাশানঐতিহ্যবাহী চামড়ার জুতো উৎপাদনসরু ছাদযুক্ত দীর্ঘ করিডোর ও প্রাকৃতিক ভেন্টিলেশন১৭৮০-পরবর্তী পুনর্নির্মাণ
জামে মসজিদ সংলগ্ন বাজারবই, আতর ও ধর্মীয় সামগ্রীমসজিদের প্রাচীর ঘেঁষা ক্লাসিক্যাল খিলানপথদ্বাদশ শতাব্দী (মূল সেলজুক ভিত্তি)

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উত্থান-পতন ও রেশম পথের গুরুত্ব

সাফাভি যুগে (১৫০১–১৭৩৬) প্রথম শাহ ইসমাইল তাবরিজকে তাঁর রাজধানী নির্ধারণ করার পর শহরটির বাণিজ্যিক প্রভাব আরও জোরদার হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী হওয়ায় তাবরিজ ছিল ইউরোপীয় বণিকদের জন্য পারস্যের প্রবেশদ্বার। অটোমানদের সাথে বারবার যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পরবর্তীতে সাফাভি রাজধানী কাজভিন ও পরে এসফাহানে স্থানান্তরিত হলেও, তাবরিজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কখনো স্তিমিত হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীতে কাজার শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্যের ত্রাবজোন বন্দরের মাধ্যমে ইউরোপের সাথে ইরানের যে সামুদ্রিক-স্থলবাণিজ্য চলত, তার সিংহভাগই এই তাবরিজ বাজারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো।

তাবরিজের বাজার কমপ্লেক্সের আনুমানিক আয়তনিক পরিসংখ্যান(সংখ্যা / একক)
মোট এলাকা (হেক্টর)75ছাদযুক্ত করিডোরের দৈর্ঘ্য (কিলোমিটার)5.5স্বতন্ত্র টিমচে ও সরাইখানা40কমপ্লেক্সের ভেতরে মসজিদ25দোকানের আনুমানিক সংখ্যা (শতকে)55

কালানুক্রমিক বিবর্তন

তাবরিজ শহরের উত্থান এবং এর ঐতিহাসিক বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের প্রধান মাইলফলকসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

  1. বিখ্যাত কবি ও পর্যটক নাসির খসরু তাবরিজ পরিভ্রমণ করেন এবং এর প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক আবহের কথা নথিভুক্ত করেন।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা

ইরানের সমাজতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে 'বাজারি' (Bazaari) বা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যার অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো তাবরিজ বাজার। এটি কেবল অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র ছিল না, বরং জনমত গঠন ও প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ১৮৯০-এর দশকে তামাক ধর্মঘটের সময় তাবরিজের বাজারের দোকানপাট বন্ধ করে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সংঘটিত ইরানি সাংবিধানিক বিপ্লবে (Constitutional Revolution) তাবরিজ বাজারের ব্যবসায়ীরা সাত্তার খান ও বাকের খানের বিপ্লবী বাহিনীকে বিপুল অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের প্রাক্কালে এবং আধুনিক ইরানি অর্থনীতিতেও এই বাজারের বাণিজ্যিক নেতৃত্ব অটুট প্রভাব বজায় রেখেছে।

১ বর্গকিলোমিটার

তাবরিজ বাজার কমপ্লেক্সের মোট আয়তন প্রায় এক বর্গকিলোমিটার, যা এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম একক ছাদযুক্ত বাজার ব্যবস্থার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার

২০১৩ সালে তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্সের সতর্ক ও নিখুঁত সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য এটি মর্যাদাপূর্ণ আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার অর্জন করে।

৫,৫০০ মিটার দীর্ঘ করিডোর

বাজারের অভ্যন্তরে অবস্থিত আন্তঃসংযুক্ত ছাদযুক্ত প্যাসেজ ও গলিগুলোর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারেরও বেশি।

অবিচ্ছিন্ন কার্যকারিতা

শত শত বছর ধরে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ সত্ত্বেও বাজারটি তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম একদিনের জন্যও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেনি।

সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতি

বিংশ শতাব্দীর আধুনিকায়নের যুগে যখন ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ছিল, তখন ইরান সরকারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থা (ICHTO) এবং স্থানীয় দোকানদার ও মালিকদের যৌথ উদ্যোগে তাবরিজ বাজারের মূল স্থাপত্য কাঠামো সফলভাবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো আধুনিক উপাদান যেমন কংক্রিট বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার না করে, প্রাচীন কৌশল অনুযায়ী পোড়ামাটি ও চুন-সুরকির মর্টার দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গম্বুজগুলো মেরামত করা হয়েছে। এই অনুকরণীয় অংশীদারিত্বমূলক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্মান লাভ করে এবং পরবর্তীতে ২০১৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ 'আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার' দ্বারা ভূষিত হয়। আজ তাবরিজ বাজার কেবল অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং এক স্পন্দিত ও জীবন্ত ঐতিহ্য, যেখানে প্রাচ্যের আবহাওয়া, স্থাপত্যের মহত্ত্ব এবং মানব বাণিজ্য এক অপূর্ব ঐকতানে বিদ্যমান।

Frequently asked questions

তাবরিজ বাজারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?

তাবরিজ বাজার ঐতিহাসিক রেশম পথের অন্যতম প্রধান নোডাল পয়েন্ট বা সংযোগস্থল ছিল। এটি আনাতোলিয়া, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যিক পণ্য বিনিময়ের মহাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইলখানাত আমলে রাজধানী হিসেবে উন্নীত হওয়ার পর এটি সমগ্র ইউরেশিয়ার অন্যতম ধনী বাণিজ্যিক শহরে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগের মঞ্চ হিসেবে বিকশিত হয়।

তাবরিজের বাজার কেন স্থাপত্যগতভাবে অনন্য?

এই বাজারটি সম্পূর্ণরূপে পোড়ামাটির ইট দ্বারা নির্মিত এবং আন্তঃসংযুক্ত ভল্ট ও গম্বুজ (ডোমস) দ্বারা আবৃত। এর অনন্য আর্কিটেকচারাল লেআউটে রয়েছে অসংখ্য রাস্তেহ (প্রধান গলি), টিমচে (গম্বুজযুক্ত দ্বি-তল বাণিজ্য হল), সরাইখানা, কারভানসারাই এবং মসজিদ। গম্বুজের শীর্ষে ওকুলাস বা আলোকছায়া ব্যবস্থা ভেতরের বায়ুর সঞ্চালন ও প্রাকৃতিক আলো নিশ্চিত করে, যা ইরানি চরম আবহাওয়া থেকে সুরক্ষার চমৎকার স্থাপত্য সমাধান।

টিমচে-ই মোজাফফরিয়ে কী এবং এর তাৎপর্য কী?

টিমচে-ই মোজাফফরিয়ে হলো তাবরিজ বাজারের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও স্থাপত্যিকভাবে নিখুঁত গম্বুজযুক্ত হল, যা কাজার আমলে যুবরাজ মোজাফফর আদ-দীন মির্জার শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল। এটি বিশেষভাবে ঐতিহ্যবাহী সূক্ষ্ম পারস্য গালিচা ও কার্পেট ব্যবসার জন্য নিবেদিত। এর দ্বিতল ইট-নির্মিত খিলান ও জটিল নকশার কারুকাজ ইরানি বাণিজ্যিক স্থাপত্যের চরম শিখর প্রদর্শন করে।

তাবরিজ বাজার কবে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা লাভ করে?

তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্সটি ২০১০ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় (মানদণ্ড ২, ৩ ও ৪-এর অধীনে) অন্তর্ভুক্ত হয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অবিচ্ছিন্ন সামাজিক-বাণিজ্যিক কার্যকারিতা এবং অতুলনীয় ইট-নির্মিত স্থাপত্যের সংরক্ষণের স্বীকৃতিস্বরূপ এটিকে এই আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেওয়া হয়।

তাবরিজের বাজারে কোন কোন বিখ্যাত পরিব্রাজক ভ্রমণ করেছিলেন?

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভেনিসীয় পর্যটক মার্কো পোলো এই বাজারে আসেন এবং এর মূল্যবান পাথর, রেশম ও ঐশ্বর্যের বিবরণ দেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত আরব পর্যটক ইবনে বতুতা এখানে এসে জহরত বাজারের অবিশ্বাস্য সম্পদের বিস্তারিত বর্ণনা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত যেমন ক্লাভিহো এবং জিন শার্দাঁও এই বাজারের সমৃদ্ধির প্রশংসা করেন।